সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার নাম নবম জাতীয় পে-স্কেল। বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ তাদের বর্তমান বেতন দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে নবম পে-স্কেল ২০২৬ এর দাবিটি অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে—দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় কি নতুন একটি বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল ঘোষণা করা সরকারের পক্ষে সম্ভব? ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবিটি কেবল মানবিক নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও যথেষ্ট যৌক্তিক।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক সক্ষমতা
অনেকেই মনে করেন যে, নতুন পে-স্কেল দিলে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল চাপ পড়বে। কিন্তু আমরা যদি বাজেট পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তবে ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৬ সালে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য ২০১৫ সালের তুলনায় সহজ হওয়ার কথা। ২০১৫ সালে যখন অষ্টম পে-স্কেল কার্যকর করা হয়েছিল, তখন জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ অর্থাৎ ১৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছিল সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা খাতে।
আরও জেনে নিনঃ প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি?
বর্তমানে দেশের বাজেটের আকার অনেক বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটের প্রেক্ষাপটে যদি নবম পে-স্কেল ২০২৬ কার্যকর করা হয়, তবে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১.০৬ লাখ কোটি টাকা। শতাংশের হিসেবে এটি মোট বাজেটের মাত্র ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে বাজেটের ওপর চাপ প্রায় ২ শতাংশ কম থাকবে।
বাজেট পরিসংখ্যান: ২০১৫ বনাম ২০২৬ (তুলনামূলক চিত্র)
নিচে একটি ছকের মাধ্যমে অষ্টম পে-স্কেল এবং প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল ২০২৬ এর সময়কালীন বাজেটের একটি স্বচ্ছ তুলনা তুলে ধরা হলো:
| বিশ্লেষণের খাত | ২০১৫-১৬ অর্থবছর (অষ্টম পে-স্কেল) | ২০২৫-২৬ অর্থবছর (প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল) |
| মোট জাতীয় বাজেট | ২.৯৫ লাখ কোটি টাকা | প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা |
| পে-স্কেল বাস্তবায়নে ব্যয় | ৪৭ হাজার কোটি টাকা | ১.০৬ লাখ কোটি টাকা (আনুমানিক) |
| বাজেটের ওপর চাপ (%) | ১৫% | ১৩% |
এই পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ২০১৫ সালের চেয়ে এখন অনেক বেশি। সুতরাং “বাজেটে টাকা নেই” এই অজুহাতটি গাণিতিকভাবে ধোপে টেকে না।
কেন এখনই নবম পে-স্কেল প্রয়োজন?
শুধুমাত্র বাজেটে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা আছে বলেই পে-স্কেল দেওয়া উচিত, বিষয়টি এমন নয়। এর পেছনে আরও গভীর কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।
১. মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়
২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ এখন আকাশছোঁয়া। ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো দিয়ে ২০২৬ সালের বাজারে টিকে থাকা একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
২. টাকার মান হ্রাস ও প্রকৃত আয়
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার মান উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। একজন কর্মচারীর বেতন যদি না বাড়ে, তবে তার “রিয়েল ইনকাম” বা প্রকৃত আয় কমে যায়। নবম পে-স্কেল ২০২৬ এই ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
৩. দুর্নীতি হ্রাস ও কাজের গতিশীলতা
যখন একজন কর্মচারী তার বেতন দিয়ে মাস চালাতে পারেন না, তখন অবচেতনভাবেই দুর্নীতির পথ প্রশস্ত হয়। সম্মানজনক বেতন কাঠামো সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং কর্মচারীদের কাজে উৎসাহিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ
যৌক্তিকতা থাকা সত্ত্বেও নবম পে-স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ বা বাধা থাকতে পারে:
- রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা: যদি সরকার কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে, তবে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে।
- উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার: মেগা প্রজেক্ট এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে সরকার অনেক সময় পরিচালন ব্যয় বা বেতন খাতে খরচ বাড়াতে দ্বিধা করে।
- মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা: অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, বাজারে হঠাৎ অর্থের প্রবাহ বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQ)
নবম পে-স্কেল ২০২৬ কি নিশ্চিতভাবে আসবে?
সরকারিভাবে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি, তবে কর্মচারীদের দাবি এবং বাজেটের সক্ষমতা বিবেচনায় এটি নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে রয়েছে।
নতুন পে-স্কেলে বেতন কত বাড়তে পারে?
সাধারণত নতুন পে-স্কেলে বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মূল বেতন ৮০% থেকে ১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়ে থাকে।
বাজেটের কত শতাংশ বেতন খাতে ব্যয় হবে?
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশাল বাজেটের মাত্র ১৩ শতাংশ খরচ করলেই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন সম্ভব।
২০১৫ সালের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা কেন?
বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা কারণ এখন বাজেটের আকার অনেক বড় এবং মুদ্রাস্ফীতির হার গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নবম পে-স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ২০১৫ সালে ছোট বাজেট নিয়েও যদি সরকার ১৫ শতাংশ ব্যয় করতে পারে, তবে বর্তমানের ৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে ১৩ শতাংশ ব্যয় করা অসম্ভব কিছু নয়। সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারের উচিত মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।