ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। রমজান মাসে রোজা পালন করা প্রত্যেক সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর ফরজ। রোজা পালনের সময় আমাদের অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় যাতে কোনো ছোট ভুলের কারণে মহান আল্লাহর এই ইবাদত নষ্ট না হয়ে যায়। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে একটি অতি পরিচিত প্রশ্ন হলো, স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙ্গে যায়? এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনেই লজ্জা ও সংকোচ কাজ করে, যার ফলে তারা সঠিক মাসয়ালা জানতে পারেন না। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে স্বপ্নদোষ এবং রোজার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
স্বপ্নদোষ কি এবং কেন হয়?
স্বপ্নদোষ বা ‘Wet Dream’ একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে বা তরুণ বয়সে এটি বেশি দেখা দেয়। ঘুমের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত হওয়াকেই সাধারণত স্বপ্নদোষ বলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এটি শরীরের অতিরিক্ত বীর্য বের করে দেওয়ার একটি প্রাকৃতিক উপায় এবং এতে স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি একটি প্রাকৃতিক বিষয় যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙ্গে যায়?
সরাসরি বলতে গেলে, ঘুমের ঘোরে স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভাঙ্গে না। এটি ইসলামের একটি সর্বসম্মত বিধান। কারণ রোজা ভঙ্গের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কাজ করা শর্ত। স্বপ্নদোষ যেহেতু মানুষের ইচ্ছার বাইরে এবং ঘুমের মধ্যে ঘটে, তাই এর মাধ্যমে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। আপনি যদি ভোরে বা দিনের বেলা ঘুমের মধ্যে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তবে আপনার রোজা ১০০% একুরেট এবং সঠিক থাকবে।
এর প্রধান কারণ হলো, মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের সাধ্যাতীত কোনো বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দেন না। ঘুমের মধ্যে মানুষ তার নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাই সেই অবস্থায় ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার জন্য সে দায়ী নয়। সুতরাং মনের মধ্যে কোনো দ্বিধা না রেখে আপনি আপনার রোজা পূর্ণ করতে পারেন।
স্বপ্নদোষ হওয়ার পর করণীয় কি?
স্বপ্নদোষ হলে রোজা না ভাঙলেও শরীর অপবিত্র হয়ে যায়। এই অবস্থায় নামাজ পড়ার জন্য বা পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করা ফরজ। যদি রোজা অবস্থায় আপনার স্বপ্নদোষ হয়, তবে করণীয়গুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. দ্রুত গোসল করা
যত দ্রুত সম্ভব ফরজ গোসল করে নেওয়া উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, রোজা অবস্থায় গড়গড়া করে কুলি করা যাবে না এবং নাকের একদম ভেতরে পানি টানা যাবে না যাতে গলার ভেতরে পানি চলে না যায়। সাধারণ কুলির মাধ্যমে মুখ পরিষ্কার করতে হবে।
২. কাপড় পরিষ্কার করা
যে পোশাকে বীর্য লেগেছে সেই অংশটি বা পুরো পোশাকটি ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। পোশাক পবিত্র না হলে ইবাদত করা সম্ভব নয়।
৩. মনের ভয় দূর করা
অনেকেই মনে করেন স্বপ্নদোষ হওয়ার পর রোজা হালকা হয়ে যায় বা সওয়াব কমে যায়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। যেহেতু এটি অনিচ্ছাকৃত, তাই আপনার সওয়াবে কোনো ঘাটতি আসবে না।
রোজা অবস্থায় গোসলের বিশেষ নিয়ম
রোজা থাকা অবস্থায় ফরজ গোসলের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সাধারণ সময়ে আমরা যেভাবে গড়গড়া করে কুলি করি বা নাকে পানি দেই, রোজা অবস্থায় তা করা নিষেধ। কারণ এতে পানি পেটে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- মুখ পরিষ্কার: তিনবার সাধারণ কুলি করতে হবে যাতে গলার গভীরে পানি না যায়।
- নাক পরিষ্কার: নাকের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে, তবে পানি ভেতরে টেনে নেওয়া যাবে না।
- পুরো শরীর ভেজানো: শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পানি পৌঁছাতে হবে যাতে কোনো অংশ শুকনো না থাকে।
ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত ও স্বপ্নদোষের পার্থক্য
স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙ্গে যায় এই প্রশ্নের পাশাপাশি আমাদের এটিও জানা জরুরি যে, ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত করলে বিধান কি। যদি কেউ জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে (যেমন হস্তমৈথুন বা অন্য কোনো উপায়ে) বীর্যপাত ঘটায়, তবে তার রোজা নিশ্চিতভাবে ভেঙ্গে যাবে। এটি একটি কবিরা গুনাহ এবং এর জন্য কাজা পালন করা জরুরি। অন্যদিকে, স্বপ্নদোষ যেহেতু ঘুমের মধ্যে ঘটে, তাই এটি রোজার কোনো ক্ষতি করে না। এই পার্থক্যটি বোঝা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
রমজানে এই বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণা ও তার প্রতিকার
আমাদের সমাজে রোজা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন স্বপ্নদোষ হওয়ার পর গোসল করতে দেরি হলে রোজা ভেঙ্গে যায়। আবার কেউ মনে করেন দিনের বেলা ঘুমানো ঠিক নয় কারণ স্বপ্নদোষ হতে পারে। এগুলো সবই ভুল ধারণা। ইসলাম আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। দিনের যেকোনো সময় ঘুমের মধ্যে এমনটি হলে আপনি পবিত্র হয়ে বাকি রোজা পূর্ণ করবেন।
বিভিন্ন ইমাম ও আলেমদের মতামত
বিশ্বের প্রথিতযশা আলেম এবং ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে, স্বপ্নদোষ রোজা ভঙ্গের কারণ নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এবং ইমাম মালেক (রহ.) সহ সকল মাযহাবের আলেমগণ একই ফতোয়া দিয়েছেন। হাদিস শরীফে এসেছে, তিনটি জিনিস মানুষের রোজা ভঙ্গ করে না: বমি (অনিচ্ছাকৃত), শিঙা লাগানো এবং স্বপ্নদোষ। সুতরাং এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
স্বপ্নদোষ হওয়ার পর কি সাথে সাথে গোসল করা জরুরি?
হ্যাঁ, নামাজের ওয়াক্ত পার হওয়ার আগেই গোসল করে নেওয়া ফরজ। তবে রোজা অবস্থায় গোসল করতে কোনো বাধা নেই।
স্বপ্নদোষ হলে কি রোজার সওয়াব কমে যায়?
না, স্বপ্নদোষ একটি প্রাকৃতিক বিষয়। এতে রোজার সওয়াব বা গুরুত্ব কোনোভাবেই কমে না।
সেহরির সময় স্বপ্নদোষ হয়েছে জানলে কি রোজা রাখা যাবে?
হ্যাঁ, গোসল করে পবিত্র হয়ে রোজা রাখা যাবে। এমনকি গোসল করতে দেরি হলেও রোজার নিয়ত করা যাবে এবং পরে গোসল করে নিতে হবে।
রোজা অবস্থায় হস্তমৈথুন করলে কি রোজা ভাঙ্গে?
হ্যাঁ, ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙ্গে যায়। এটি অত্যন্ত গুনাহের কাজ।
শরীর অপবিত্র অবস্থায় কতক্ষণ থাকা যায়?
ফরজ ইবাদত বা নামাজের সময় হওয়ার আগেই পবিত্র হওয়া জরুরি। বিনা কারণে দীর্ঘ সময় অপবিত্র থাকা ইসলামে পছন্দনীয় নয়।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙ্গে যায় এই দুশ্চিন্তা থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া উচিত। ইসলাম একটি সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। অনিচ্ছাকৃতভাবে শরীরে কোনো পরিবর্তন ঘটলে তার জন্য মহান আল্লাহ বান্দাকে শাস্তি দেন না বা তার ইবাদত নষ্ট করেন না। তবে আমাদের দায়িত্ব হলো অপবিত্র হওয়ার পর দ্রুত পবিত্রতা অর্জন করা এবং সঠিক নিয়মে ইবাদত চালিয়ে যাওয়া। রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং সঠিক মাসয়ালা জেনে রোজা পালন করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। আশা করি এই পোস্টটি আপনাদের মনের সংশয় দূর করতে সহায়ক হয়েছে।