ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। পবিত্র রমজান মাসে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর রোজা রাখা ফরজ। তবে অনেক সময় না জানার কারণে আমাদের রোজা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। এই আর্টিকেলে আমরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ও সহজ ভাষায় রোজা ভেঙে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনাকে শরিয়তসম্মতভাবে রোজা পালনে সাহায্য করবে।
রোজা ভঙ্গের গুরুত্ব ও ইসলামের বিধান
রোজা কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধির একটি প্রক্রিয়া। রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুমিন মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। তবে ইসলামি ফিকহ শাস্ত্র অনুযায়ী কিছু সুনির্দিষ্ট কাজ রয়েছে যা করলে রোজা বাতিল হয়ে যায়। এই কারণগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়— যা করলে কেবল কাজা ওয়াজিব হয় এবং যা করলে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়। রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি মূলত সেই সমস্ত কাজের সমষ্টি যা আমাদের রোজা পালনের সময় এড়িয়ে চলতে হবে।
রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি (বিস্তারিত তালিকা)
নিচে রোজা ভঙ্গের সেই সকল কারণগুলো পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো যা আপনার রোজা পালনের সময় সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখা উচিত।
১. স্বেচ্ছায় পানাহার করা
রোজার মৌলিক শর্ত হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করে, তবে তার রোজা ভেঙে যাবে। এটি রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২. সহবাস বা শারীরিক মিলন
রোজা অবস্থায় দিনের বেলা স্ত্রীর সাথে শারীরিক মিলনে লিপ্ত হলে রোজা ভেঙে যায়। এই ক্ষেত্রে কেবল রোজার কাজা করলেই হয় না, বরং কঠিন কাফফারা আদায় করতে হয়।
৩. ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করা
যদি কারো অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হয়, তবে রোজা নষ্ট হয় না। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আঙ্গুল দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে মুখ ভরে বমি করে, তবে তার রোজা ভেঙে যাবে।
৪. নস্যি গ্রহণ করা বা নাকে ওষুধ দেওয়া
নাক দিয়ে কোনো তরল ওষুধ বা নস্যি গ্রহণ করলে তা যদি সরাসরি মস্তিষ্কে বা পেটে পৌঁছায়, তবে রোজা ভেঙে যায়। চিকিৎসার প্রয়োজনে এটি করার আগে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. কানে ওষুধ বা তেল দেওয়া
কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে এবং সেখান থেকে ওষুধ বা তেল যদি সরাসরি কণ্ঠনালি বা পেটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে, তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী রোজা ভেঙে যেতে পারে। তবে কানের পর্দায় ছিদ্র না থাকলে সাধারণ ড্রপ ব্যবহারে রোজা নষ্ট হয় না।
৬. প্রস্রাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে ওষুধ গ্রহণ
মলদ্বার বা মূত্রনালি দিয়ে কোনো তরল বা শক্ত ওষুধ (যেমন সাপোজিটরি) গ্রহণ করলে রোজা নষ্ট হয়ে যায়। এটি রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি এর অন্তর্ভুক্ত একটি বিশেষ মাসআলা।
৭. কুলি করার সময় অনিচ্ছায় পানি পেটে চলে যাওয়া
রোজা অবস্থায় ওজু বা অন্য কোনো কারণে কুলি করার সময় যদি অসতর্কতাবশত পানি গলার নিচে চলে যায়, তবে সেই রোজাটি নষ্ট হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এর কাজা করতে হয়।
৮. ধূমপান বা হুক্কা সেবন
বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা বা ইলেকট্রনিক সিগারেট সেবন করলে রোজা ভেঙে যায়। ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ফুসফুসে নেওয়া রোজা ভঙ্গের অন্যতম কারণ।
৯. সুগন্ধি ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ
আগরবাতি বা অন্য কোনো সুগন্ধির ধোঁয়া যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে টেনে নেওয়া হয়, তবে রোজা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে সাধারণ সুগন্ধি বা আতর ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই।
১০. কফ বা শ্লেষ্মা গিলে ফেলা
যদি গলার ভেতর কফ বা শ্লেষ্মা চলে আসে এবং তা মুখ পর্যন্ত পৌঁছানোর পর পুনরায় ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, তবে অনেক ফকিহদের মতে রোজা নষ্ট হয়ে যায়।
১১. দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার খাওয়া
যদি দাঁতের ফাঁকে চোলার সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বড় কোনো খাদ্যকণা আটকে থাকে এবং তা জবান দিয়ে বের না করে গিলে ফেলা হয়, তবে রোজা ভেঙে যায়।
১২. রক্তক্ষরণ বা হিজামা করা (বিতর্কিত কিন্তু সতর্কতামূলক)
শরীরে থেকে অতিরিক্ত রক্ত বের হয়ে যদি রোজাদার দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে একে মাকরূহ বা রোজা ভঙ্গের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। তবে সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় রোজা ভাঙে না।
১৩. ইনজেকশন বা স্যালাইনের মাধ্যমে পুষ্টি গ্রহণ
সাধারণ চিকিৎসার ইনজেকশনে রোজা ভাঙে না। তবে যদি এমন কোনো ইনজেকশন বা স্যালাইন দেওয়া হয় যা সরাসরি শরীরে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে বা পুষ্টি যোগায়, তবে রোজা নষ্ট হয়ে যায়।
১৪. ঋতুস্রাব বা হায়েজ-নেফাস
রোজা থাকা অবস্থায় কোনো মহিলার ঋতুস্রাব শুরু হলে তার রোজা তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যায়। পরবর্তীতে এই রোজার কাজা আদায় করতে হয়।
১৫. বীর্যপাত ঘটানো
ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন বা অন্য কোনো অনৈতিক কাজের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যায়। এটি রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি তালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
১৬. দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে পেটে যাওয়া
দাঁত থেকে নির্গত রক্ত যদি থুতুর চেয়ে পরিমাণে বেশি হয় এবং তা থুতুর সাথে মিশে পেটে চলে যায়, তবে রোজা নষ্ট হয়ে যায়।
১৭. পাথর বা কঙ্কর গিলে ফেলা
যদি কেউ ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে অখাদ্য কোনো বস্তু যেমন মাটির ঢিলা, পাথর বা কঙ্কর গিলে ফেলে, তবে তার রোজা ভেঙে যাবে।
১৮. রোজা ভঙ্গ করার দৃঢ় সংকল্প
কেউ যদি রোজা থাকা অবস্থায় মনে মনে স্থির করে ফেলে যে সে এখন রোজা ভেঙে ফেলবে এবং সেই অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে অনেক আলেমের মতে তার রোজার সওয়াব নষ্ট হয় বা রোজা ভেঙে যায়।
১৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা পাগল হওয়া
যদি কেউ রোজা থাকা অবস্থায় দিনের বড় একটি অংশ অজ্ঞান হয়ে থাকেন অথবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, তবে তার রোজা কার্যকর থাকে না।
রোজা মাকরূহ হওয়ার কারণসমূহ
রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি জানার পাশাপাশি কোন কাজগুলো করলে রোজা মাকরূহ হয় তাও জেনে রাখা ভালো। মাকরূহ মানে হলো রোজা পুরোপুরি ভেঙে না গেলেও রোজার সওয়াব ও মর্যাদা কমে যাওয়া।
- অপ্রয়োজনে কোনো খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা।
- রোজা অবস্থায় পরনিন্দা বা গিবত করা।
- অযথা মুখে অনেক থুতু জমা করে গিলে ফেলা।
- ঝগড়া বা অশ্লীল ভাষায় কথা বলা।
রোজা অবস্থায় যা করা জায়েজ
অনেকেই মনে করেন দাঁত ব্রাশ করলে বা আতর মাখলে রোজা ভেঙে যায়। কিন্তু শরিয়ত অনুযায়ী নিচের কাজগুলো করা জায়েজ:
- মেসওয়াক করা (তবে টুথপেস্ট ব্যবহার না করাই ভালো)।
- শরীরে তেল বা সুগন্ধি মাখা।
- অনিচ্ছাকৃতভাবে ধুলোবালি বা ধোঁয়া নাকে প্রবেশ করা।
- স্বপ্নদোষ হলে রোজা নষ্ট হয় না।
- অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হওয়া।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?
হাঁপানি রোগীদের জন্য ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যায়, কারণ এটি তরল ওষুধের কণা ফুসফুসে পাঠায়। তবে জীবন রক্ষার প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করা যাবে এবং পরবর্তীতে রোজার কাজা করতে হবে।
ইনজেকশন দিলে কি রোজা নষ্ট হয়?
সাধারণ মাংসপেশি বা শিরার ইনজেকশনে রোজা নষ্ট হয় না। তবে গ্লুকোজ বা পুষ্টিবর্ধক ইনজেকশন নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি এর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে সাধারণ ভুল?
সাধারণত কুলি করার সময় পেটে পানি চলে যাওয়া এবং দাঁতের ফাঁকে থাকা খাবার গিলে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল হিসেবে দেখা যায়।
ভুল করে খেয়ে ফেললে কি রোজা ভেঙে যায়?
না, যদি আপনি পুরোপুরি ভুলে গিয়ে কিছু খেয়ে বা পান করে ফেলেন এবং মনে পড়ার সাথে সাথে তা বন্ধ করেন, তবে আপনার রোজা ভাঙবে না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, রোজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি সুশৃঙ্খল জীবন ব্যবস্থা। রোজা ভঙ্গের কারণ ১৯টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে আমরা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই ইবাদত পালন করতে পারব। মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দার নিয়ত দেখেন। তবে শরিয়তের নিয়মগুলো মেনে চলাও প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। আশা করি এই তালিকাটি আপনার পবিত্র রমজানের প্রস্তুতিকে আরও সহজ করবে।