রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। এই পবিত্র মাসে রোজা পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর ফরজ। তবে যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে ‘নিয়ত’ একটি মৌলিক বিষয়। বিশেষ করে রোজা রাখার নিয়ত (Roja Rakhar Niyat) ব্যতীত রোজা পূর্ণতা পায় না। আমরা অনেকেই রোজা রাখার সঠিক পদ্ধতি বা নিয়ত করার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই। আজকের এই নিবন্ধে আমরা রোজা রাখার নিয়ত, ইফতারের দোয়া এবং রোজা সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করব। ২০২৬ সালের রমজানকে সামনে রেখে এই গাইডলাইনটি আপনাকে সহিহভাবে ইবাদত সম্পন্ন করতে সাহায্য করবে।
নিয়ত কী এবং কেন জরুরি?
ইসলামি পরিভাষায় ‘নিয়ত’ শব্দের অর্থ হলো মনের সংকল্প। কোনো কাজ শুরু করার আগে মন থেকে সেই কাজের ইচ্ছা পোষণ করাই হলো নিয়ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” সুতরাং, রোজা রাখার নিয়ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়, বরং মনে মনে স্থির করা যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল রোজা রাখব।
রোজা রাখার নিয়ত (Roja Rakhar Niyat)
অনেকে মনে করেন রোজা রাখার জন্য নির্দিষ্ট কোনো আরবি বাক্য মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। আপনি যদি শেষ রাতে সেহরি খেতে ওঠেন, তবে সেই সেহরি খাওয়ার উদ্দেশ্যই হলো রোজা রাখা, আর এটাই আপনার নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে আপনি চাইলে মনে মনে বা মুখে নিচের এই প্রচলিত নিয়তটি করতে পারেন:
আরবি নিয়ত: نَوَيْتُ اَنْ اَصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اَللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّي اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ
উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার সন্তুষ্টির জন্য রমজান মাসের আগামীকালের ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করছি। আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
নিয়ত কখন করতে হয়?
রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত সুবহে সাদেকের আগেই করে নেওয়া উত্তম। তবে যদি কেউ সেহরির সময় উঠতে না পারেন, তবে দিনের মধ্যভাগের আগে (যাওয়ালের আগে) নিয়ত করলেও রোজা হয়ে যাবে। তবে নফল রোজার ক্ষেত্রে সুবহে সাদেকের আগে নিয়ত করা জরুরি।
ইফতারের দোয়া ও ফজিলত
সারাদিন রোজা রাখার পর সূর্যাস্তের সময় হালাল খাবার গ্রহণ করে রোজা ভঙ্গ করাকে ইফতার বলা হয়। ইফতারের মুহূর্তটি অত্যন্ত বরকতময়। হাদিসে এসেছে, ইফতারের সময় আল্লাহর কাছে করা দোয়া কবুল হয়। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে নিচের দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত:
আরবি দোয়া: اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার জন্যই রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়েই ইফতার করছি।
ইফতারের পর পানির তৃষ্ণা মিটলে নিচের দোয়াটি পড়াও সুন্নত: উচ্চারণ: জাহাবায যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ
রোজা রাখার নিয়ত করার পর সারাদিন কিছু কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। যদি ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে নিচের কাজগুলো করা হয়, তবে রোজা ভেঙে যেতে পারে: ১. ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা। ২. সহবাসে লিপ্ত হওয়া। ৩. মুখ ভরে বমি করা। ৪. বিড়ি, সিগারেট বা হুক্কা পান করা। ৫. দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা ছোলার মতো বড় কোনো অংশ গিলে ফেলা।
সেহরির গুরুত্ব ও সময়সীমা
রোজা রাখার জন্য সেহরি খাওয়া একটি বরকতময় সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।” সেহরি খাওয়ার ফলে দিনের বেলা রোজা রাখার শক্তি পাওয়া যায়। সেহরির শেষ সময়ের দিকে খাবার গ্রহণ করা উত্তম, তবে সাবধান থাকতে হবে যেন সুবহে সাদেকের আগে খাবার শেষ হয়।
রমজানে করণীয় ইবাদতসমূহ
কেবল না খেয়ে থাকাই রোজা নয়। রোজা রাখার নিয়ত করার পর একজন মুমিনের আচরণে পরিবর্তন আসা জরুরি। রমজানে বেশি বেশি নিচের আমলগুলো করা উচিত:
- কুরআন তিলাওয়াত: এই মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই এটি তিলাওয়াতের শ্রেষ্ঠ সময়।
- তারাবিহ সালাত: এশার নামাজের পর ২০ রাকাত তারাবিহ আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
- সদকা ও দান: রমজানে অন্য মাসের তুলনায় দানের সওয়াব অনেক গুণ বেশি।
- জিকির ও ইস্তিগফার: সারাদিন জিব্বাকে আল্লাহর জিকিরে সিক্ত রাখা।
রোজার বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
রোজা কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এর অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে:
- রোজা শরীরের বিষাক্ত উপাদান (Toxins) বের করে দিতে সাহায্য করে।
- এটি পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দেয় এবং মেদ কমাতে সাহায্য করে।
- রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়।
- মানসিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা বৃদ্ধি করে।
মাসবুক বা রোজা কাজা হওয়ার বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতা বা সফরের কারণে রোজা রাখতে না পারেন, তবে পরবর্তী সময়ে সেই রোজা কাজা করে নিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ফরজ রোজা ত্যাগ করলে সারা জীবন রোজা রেখেও তার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব নয়। বার্ধক্যজনিত কারণে যারা রোজা রাখতে একদমই অক্ষম, তারা ‘ফিদ্যাহ’ বা দান করার মাধ্যমে এর ক্ষতিপূরণ করতে পারেন।
সামাজিক জীবনে রোজার প্রভাব
রোজা মানুষকে ধৈর্য ও সহমর্মিতা শেখায়। একজন রোজাদার যখন ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করেন, তখন তিনি সমাজের অভাবী মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। এর মাধ্যমে সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সৃষ্টি হয়। রোজা রাখার নিয়ত মানুষকে পাপাচার থেকে বিরত রেখে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।ত
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
রোজা রাখার নিয়ত কি মুখে উচ্চারণ করা জরুরি?
না, নিয়ত মূলত মনের সংকল্প। আপনি যদি মনে মনে স্থির করেন যে রোজা রাখবেন, তবেই নিয়ত হয়ে যাবে। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে করলে কোনো সমস্যা নেই।
সেহরি না খেলে কি রোজা হবে?
হ্যাঁ, সেহরি না খেলেও রোজা হবে। তবে সেহরি খাওয়া সুন্নাত এবং এতে অনেক বরকত রয়েছে।
সেহরির সময় শেষ হওয়ার কতক্ষণ পর পর্যন্ত নিয়ত করা যায়?
রমজানের ফরজ রোজার জন্য দিনের অর্ধেক অর্থাৎ দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যায়, তবে শর্ত হলো সুবহে সাদেকের পর থেকে তখন পর্যন্ত রোজার পরিপন্থী কোনো কাজ (যেমন পানাহার) করা যাবে না।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, রোজা রাখার নিয়ত (Roja Rakhar Niyat) এবং ইফতারের সঠিক পদ্ধতি জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। রমজান মাস আমাদের সামনে নিজেকে শুদ্ধ করার এক সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে। সঠিক নিয়মে রোজা পালন, নিয়মিত সালাত আদায় এবং কুরআনের সংস্পর্শে থাকার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। ২০২৬ সালের পবিত্র রমজান আমাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি ও কল্যাণ। আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনার রমজানের প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।