জেফরি এপস্টেইন নামটি আজ বিশ্বজুড়ে অপরাধ, ক্ষমতা আর রহস্যের প্রতীক। Jeffrey Epstein কীভাবে একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক থেকে ধনকুবের হয়ে উঠলেন, কারা ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ, আর কীভাবে একের পর এক অভিযোগে তিনি বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে এলেন—এই লেখায় তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম দিকের কর্মজীবন থেকে শুরু করে যৌন নিপীড়নের মামলা, বিচার প্রক্রিয়া এবং তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ পাওয়া নথিপত্র—সবকিছুই এখানে ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শুরুর জীবন ও শিক্ষকতা
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া Jeffrey Epstein বেড়ে ওঠেন মধ্যবিত্ত পরিবেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়লেও ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি। তবু মেধা ও আত্মবিশ্বাসের জোরে ১৯৭০-এর দশকে তিনি নিউইয়র্কের নামকরা ডাল্টন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে তাঁর পড়ানোর ধরন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নজর কাড়ে। এক শিক্ষার্থীর বাবার মাধ্যমেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

ওয়াল স্ট্রিটে উত্থান
ডাল্টন স্কুলের এক অভিভাবক তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন বিনিয়োগ ব্যাংক বিয়ার স্টিয়ার্নসের এক জ্যেষ্ঠ অংশীদারের সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই এপস্টেইন ব্যাংকিং দুনিয়ায় প্রবেশ করেন এবং মাত্র চার বছরে অংশীদার হয়ে ওঠেন। এই দ্রুত উত্থান তাঁকে পরিচিত করে তোলে উচ্চবিত্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে, যা পরবর্তীতে তাঁর ব্যবসার ভিত্তি গড়ে দেয়।
নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও বিপুল সম্পদ
১৯৮২ সালের দিকে এপস্টেইন প্রতিষ্ঠা করেন J. Epstein & Company। এই প্রতিষ্ঠান মূলত এমন গ্রাহকদের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করত, যাদের সম্পদের পরিমাণ ছিল এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি বড় হয় এবং এপস্টেইনের ব্যক্তিগত সম্পদও বাড়তে থাকে। ফ্লোরিডায় প্রাসাদ, নিউ মেক্সিকোতে খামার, নিউইয়র্কে বিশাল বাড়ি—সব মিলিয়ে তিনি ধনকুবের হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক
এপস্টেইনের সামাজিক বলয় ছিল বিস্তৃত। রাজনীতিবিদ, শিল্পী, ব্যবসায়ী—সবাই তাঁর পার্টিতে যেতেন। ২০০২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন ব্যবসায়ী Donald Trump এপস্টেইনকে ‘দারুণ মানুষ’ বলেছিলেন। যদিও পরে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁদের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়েছিল।
এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠদের তালিকায় ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট Bill Clinton, অভিনেতা Kevin Spacey ও Chris Tucker। এই সম্পর্কগুলো তাঁকে আরও প্রভাবশালী করে তোলে।

ব্যক্তিগত জীবন ও রহস্য
এপস্টেইন নিজের ব্যক্তিগত জীবন আড়ালে রাখতে পছন্দ করতেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে খুব কমই যেতেন। তাঁর প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন Ghislaine Maxwell এবং ইভা অ্যান্ডারসন ডুবিনের মতো নারীরা। কখনো বিয়ে করেননি তিনি। ঘনিষ্ঠরা বলতেন, তাঁর জীবন ছিল অনেকটা ধোঁয়াশায় ঘেরা।
প্রথম অভিযোগ ও তদন্ত
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় এক কিশোরীর পরিবার এপস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করে। পুলিশের তল্লাশিতে তাঁর বাড়ি থেকে বহু মেয়ের ছবি উদ্ধার হয়। তদন্তে উঠে আসে, বছরের পর বছর ধরে তিনি কম বয়সী মেয়েদের যৌন নিপীড়ন করেছেন। এই সময় থেকেই Jeffrey Epstein নামটি ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
সমঝোতা ও বিতর্ক
২০০৮ সালে এপস্টেইন কৌঁসুলিদের সঙ্গে একটি বিতর্কিত সমঝোতায় পৌঁছান। এর ফলে তিনি ফেডারেল মামলার হাত থেকে রক্ষা পান এবং মাত্র ১৮ মাসের সাজা হয়। সাজাভোগের সময়ও তাঁকে দিনের বড় অংশ অফিসে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই চুক্তিকে অনেকেই ‘শতাব্দীর সমঝোতা’ বলে আখ্যা দেন, কারণ এতে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়।
আবার গ্রেপ্তার ও মৃত্যু
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে আবার গ্রেপ্তার হন এপস্টেইন। অভিযোগ ছিল, যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে নারীদের পাচার। আদালত জামিন না দেওয়ায় তাঁকে মেট্রোপলিটন কারাগারে রাখা হয়। বিচার শুরুর আগেই ১০ আগস্ট ২০১৯ তিনি কারাগারে মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আজও আলোচনায়।
এপস্টেইন ফাইলস ও নতুন তথ্য
২০২৫ সালে মার্কিন কংগ্রেসে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাস হয়। এর ফলে লাখ লাখ পৃষ্ঠা নথি প্রকাশ করা হয়, যেখানে এপস্টেইনের জীবন ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের তাঁর বাড়ির অপ্রকাশিত ছবিও সামনে আসে, যা জনমনে নতুন করে আলোড়ন তোলে।
গিলেন ম্যাক্সওয়েলের বিচার
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর আলোচনায় আসেন গিলেন ম্যাক্সওয়েল। ২০২০ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২১ সালে জুরি তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। বিচার চলাকালে প্রমাণ হয়, কম বয়সী মেয়েদের প্রলোভন দেখিয়ে এপস্টেইনের কাছে নিয়ে যেতেন তিনি।
প্রশ্ন–উত্তর
Jeffrey Epstein কীভাবে এত প্রভাবশালী হলেন?
আর্থিক দক্ষতা, উচ্চবিত্ত গ্রাহক এবং ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে প্রভাবশালী করে তোলে।
তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ কী ছিল?
কম বয়সী মেয়েদের যৌন নিপীড়ন ও পাচার।
এপস্টেইন ফাইলস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এতে তাঁর অপরাধ নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
শেষ কথা
জেফরি এপস্টেইনের জীবন কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধের গল্প নয়; এটি ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাবের অন্ধকার দিকের প্রতিচ্ছবি। Jeffrey Epstein কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধ চালিয়ে গেছেন, তা বিশ্ববাসীর জন্য বড় শিক্ষা। তাঁর কাহিনি দেখায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে সমাজ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।