বর্তমান যুগে শিক্ষার ধরণ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পরিবর্তনের এই হাওয়ায় আমাদের দেশের শিক্ষাঙ্গনও পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ছিল যখন ব্ল্যাকবোর্ড, চক আর ডাস্টারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের পড়াশোনা। শিক্ষকরা বই দেখে পড়াতেন আর শিক্ষার্থীরা তা মুখস্থ করত। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রজেক্টর, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের ছোঁয়ায় বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ শেখা অনেক সহজ হয়ে গেছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতির ফলে ক্লাসরুমগুলো এখন আর বোরিং বা একঘেয়ে নেই, বরং হয়ে উঠেছে অনেক বেশি প্রাণবন্ত। শিক্ষার্থীরা এখন আনন্দের সাথে শিখতে পারছে এবং কঠিন বিষয়গুলো সহজে আয়ত্ত করতে পারছে।
বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল যন্ত্রপাতির সহায়তা নেওয়া। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে সনাতন পদ্ধতির সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটানো হয়। আগে যেখানে শুধুমাত্র শিক্ষকের মুখের কথাই ছিল শিক্ষার মাধ্যম, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে স্মার্টফোন, স্মার্টবোর্ড, ল্যাপটপ এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ।
আরও জানুনঃ সুষম খাদ্য কাকে বলে?
শিক্ষকরা এখন ক্লাসে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী পড়ানোর সময় শুধুমাত্র বইয়ের তথ্যের ওপর নির্ভর করেন না। তাঁরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে কবিদের ছবি, ভিডিও চিত্র বা তাঁদের নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করা গান বা কবিতা শিক্ষার্থীদের শোনাতে পারেন। ব্যাকরণের সন্ধি বিচ্ছেদ বা সমাসের মতো জটিল নিয়মগুলো এখন অ্যানিমেশনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি দেখে এবং শুনে অনেক দিন মনে রাখতে পারে। ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং বাংলা টাইপিং সফটওয়্যারের ব্যবহারও এই প্রক্রিয়ার অংশ।
কেন প্রয়োজন প্রযুক্তির ব্যবহার?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে। আজকের প্রজন্ম হলো প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম। তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং তা ধরে রাখা সনাতন পদ্ধতিতে বেশ কঠিন।
- ভিজ্যুয়াল লার্নিং: শিক্ষার্থীরা শুনে শেখার চেয়ে দেখে শিখতে বেশি পছন্দ করে। প্রযুক্তির কল্যাণে সাহিত্যের ঘটনাপ্রবাহ চোখের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়।
- শুদ্ধ উচ্চারণ: বাংলা ভাষার সঠিক উচ্চারণ শেখার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি জাদুর মতো কাজ করে। ইউটিউব বা বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রমিত বাংলা উচ্চারণের টিউটোরিয়াল দেখে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে।
- তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশ: বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাংলা সাহিত্যের দুর্লভ বই বা নথি ই-লাইব্রেরির মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। এটি গবেষণার পথকে সুগম করেছে।
আধুনিক শিক্ষার সুফলসমূহ
প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বাংলা শিক্ষায় যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা অনস্বীকার্য। এর ফলে শিখন-শেখানো কার্যক্রম অনেক বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে। নিচে এর কিছু প্রধান সুফল আলোচনা করা হলো:
১. আকর্ষণীয় উপস্থাপন: মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে সাহিত্যের জটিল বিষয়গুলো সহজে এবং আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়। এতে ক্লাসের একঘেয়েমি দূর হয়।
২. দূরশিক্ষণ সুবিধা: জুম বা গুগল মিটের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে ঘরে বসেই দেশের সেরা শিক্ষকদের ক্লাস করা সম্ভব হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে আমরা এর কার্যকারিতা দেখেছি।
৩. ইন্টারেক্টিভ লার্নিং: কুইজ, অনলাইন টেস্ট এবং গেমের মাধ্যমে ব্যাকরণ শেখা অনেক বেশি মজার হয়ে উঠেছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়।
৪. সম্পদ সংরক্ষণ: ডিজিটাল ফরম্যাটে লেকচার নোট এবং ক্লাস রেকর্ড করে রাখা যায়। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে যেকোনো সময় তা দেখে নিতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছু চ্যালেঞ্জ ও কুফল
মুদ্রার যেমন এপিঠ-ওপিঠ আছে, তেমনি বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতিরিক্ত প্রযুক্তি নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু খারাপ অভ্যাসের জন্ম দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সৃজনশীল লিখনের ক্ষমতা কমে যাওয়া। সবকিছু ডিজিটাল হওয়ার কারণে হাতে লেখার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। ফলে পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং বানান ভুলের প্রবণতা বাড়ছে। অটো-কারেক্ট বা স্পেল-চেকার ব্যবহারের ফলে তারা নিজেরা সঠিক বানান মনে রাখার চেষ্টা করছে না। এছাড়া বেশিক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ক্লাসের সময় গোপনে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার ফলে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটার উদাহরণও কম নয়।
গ্রাম ও শহরের শিক্ষায় ডিজিটাল বৈষম্য
আমাদের দেশে গ্রাম এবং শহরের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগের ক্ষেত্রে এখনো বিশাল ব্যবধান বা “ডিজিটাল ডিভাইড” রয়ে গেছে। শহরের নামী স্কুলগুলোতে যেখানে স্মার্ট ক্লাসরুম আছে, গ্রামের অনেক স্কুলে সেখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থাই নড়বড়ে।
| তুলনার বিষয় | শহরের শিক্ষা | গ্রামের শিক্ষা |
| ইন্টারনেট সুবিধা | ব্রডব্যান্ড ও ফোর-জি অত্যন্ত সহজলভ্য | গতি ধীর এবং সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয় |
| ডিভাইস প্রাপ্যতা | বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর নিজস্ব স্মার্ট ডিভাইস আছে | সাধারণত একটি ডিভাইস পরিবারের সবাই ব্যবহার করে |
| শিক্ষক প্রশিক্ষণ | প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা বেশি | প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব প্রকট |
শিক্ষকের ভূমিকা ও নতুন দিগন্ত
শিক্ষকদের জন্য বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি তাদের দক্ষতা বাড়ানোর বড় সুযোগ। অনেক প্রবীণ শিক্ষকের জন্য হয়তো ল্যাপটপ বা প্রজেক্টর চালানো শুরুতে ভয়ের কারণ হতে পারে। কিন্তু উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ভয় কাটানো সম্ভব। প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষকরা খুব সহজেই পাঠ পরিকল্পনা বা লেসন প্ল্যান তৈরি করতে পারেন। অনলাইনে বিভিন্ন রিসোর্স শেয়ার করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সাথে ক্লাসের বাইরেও যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়। এটি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে আরও নিবিড় করে তোলে।
প্রশ্ন-উত্তর
প্রযুক্তি কি বাংলা হাতের লেখাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?
হ্যাঁ, অতিরিক্ত টাইপিং এবং টাচ স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে হাতে লেখার অভ্যাস কমে যাচ্ছে, যা হাতের লেখার গুণমান কমিয়ে দিতে পারে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি হাতে লেখার চর্চাও চালিয়ে যেতে হবে।
বাংলা ব্যাকরণ শিখতে প্রযুক্তি কীভাবে সাহায্য করে?
ব্যাকরণের জটিল নিয়মগুলো অ্যানিমেশন এবং গ্রাফিক্সের মাধ্যমে উপস্থাপন করলে তা বোঝা সহজ হয়। বিভিন্ন কুইজ অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খেলার ছলে ব্যাকরণ চর্চা করতে পারে।
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কি প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব?
বর্তমানে সব প্রতিষ্ঠানে সম্ভব না হলেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ধাপে ধাপে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, বাংলা পাঠদানে প্রযুক্তি ব্যবহার কোনো বিলাসিতা নয় বরং এটি সময়ের প্রয়োজন। বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে হলে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে একে গ্রহণযোগ্য করতে হলে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। তবে প্রযুক্তির অন্ধ অনুকরণ করা যাবে না। এর সুফলগুলোকে কাজে লাগাতে হবে এবং কুফলগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা একটি আধুনিক ও জ্ঞাননির্ভর সমাজ গড়ে তুলতে পারব। বাংলা ভাষার মাধুর্য প্রযুক্তির ডানায় ভর করে ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে।