বাংলাদেশে যেকোনো পর্যায়ের নির্বাচনতা জাতীয় সংসদ নির্বাচন হোক কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য একদল দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মাঠ পর্যায়ে যারা সরাসরি ভোটারদের সাথে কাজ করেন, তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো ‘পোলিং অফিসার‘। অনেক সময় সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, পোলিং অফিসারের কাজ কি? বা একজন পোলিং অফিসারকে ঠিক কী কী দায়িত্ব পালন করতে হয়?
নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পোলিং অফিসারদের ভূমিকা অপরিসীম। একজন ভোটার ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের পর থেকে ভোট দিয়ে বের হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পোলিং অফিসাররা সহায়তা করেন। আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা পোলিং অফিসারের কাজ কি, তাদের দায়িত্বের ধরন এবং নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
আরও জেনে নিনঃ পোলিং এজেন্ট এর কাজ কি ও দায়িত্ব?
পোলিং অফিসারের কাজ কি?
সহজ কথায় বলতে গেলে, ভোটকেন্দ্রে ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং তাকে ভোট দেওয়ার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যালট পেপার বা ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই হলো পোলিং অফিসারের কাজ। একজন পোলিং অফিসার প্রিসাইডিং অফিসারের অধীনে থেকে ভোট গ্রহণের প্রাথমিক ও কারিগরি কাজগুলো সম্পন্ন করেন। ভোটারের আঙুলে কালি লাগানো থেকে শুরু করে ভোটার তালিকায় নাম যাচাই—সবই তার কাজের অংশ।
পোলিং অফিসারের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য
একটি ভোটকেন্দ্রে সাধারণত একাধিক পোলিং অফিসার থাকেন। পোলিং অফিসার ১, ২ এবং ৩ নামে তাদের দায়িত্বগুলো ভাগ করা থাকে। নিচে তাদের প্রধান কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো:
- ভোটারের পরিচয় শনাক্তকরণ: ভোটকেন্দ্রে কোনো ভোটার প্রবেশ করলে প্রথমেই তার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা ভোটার স্লিপের সাথে কেন্দ্রের মূল ভোটার তালিকার তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। এই কাজটি করেন প্রথম পোলিং অফিসার।
- ভোটার তালিকায় নাম কাটা: ভোটার সঠিক হলে তালিকায় থাকা তার নামের পাশে নির্দিষ্ট চিহ্ন দেওয়া হয় যাতে বোঝা যায় তিনি ভোট দিতে এসেছেন।
- অমোচনীয় কালি ব্যবহার: ভোটার শনাক্ত হওয়ার পর দ্বিতীয় পোলিং অফিসার ভোটারের বাম হাতের নখের গোড়ায় অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেন। এটি মূলত জাল ভোট রোধ এবং পুনরায় ভোট দেওয়া ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়।
- স্বাক্ষর বা টিপসই গ্রহণ: ভোটার তালিকায় ভোটারের স্বাক্ষর অথবা বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ নেওয়া পোলিং অফিসারের একটি আবশ্যিক আইনি দায়িত্ব।
- ব্যালট ইস্যু: সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ভোটারকে নির্দিষ্ট ব্যালট পেপার প্রদান করা হয়। ব্যালটের পেছনে পোলিং অফিসার বা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের সিল ও স্বাক্ষর আছে কিনা তা নিশ্চিত করা হয়।
- ইভিএম নিয়ন্ত্রণ: যদি ভোট ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে হয়, তবে পোলিং অফিসার ডিজিটাল কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে ভোটারকে ভোট দেওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।
পোলিং অফিসার ১, ২ এবং ৩ এর কাজের পার্থক্য
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পোলিং অফিসারদের কাজ সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত থাকে। নিচের ছক থেকে তাদের কাজের পার্থক্য সহজে বোঝা যাবে:
| পোলিং অফিসারের পদ | প্রধান দায়িত্ব ও কাজ |
| পোলিং অফিসার-১ | ভোটার তালিকা অনুযায়ী ভোটারের নাম ও সিরিয়াল নম্বর যাচাই করা এবং উচ্চস্বরে ঘোষণা করা। |
| পোলিং অফিসার-২ | ভোটারের হাতে অমোচনীয় কালি লাগানো এবং ভোটার তালিকায় স্বাক্ষর বা টিপসই সংগ্রহ করা। |
| পোলিং অফিসার-৩ | ভোটারকে নির্দিষ্ট ব্যালট পেপার ছেঁড়া ও ভাঁজ করে দেওয়া (ইভিএম হলে ডিজিটাল অনুমতি দেওয়া)। |
পোলিং অফিসার হওয়ার যোগ্যতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একটি সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব। এই পদের জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র থেকে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়:
১. পেশাগত যোগ্যতা
পোলিং অফিসার হতে হলে সাধারণত সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হতে হয়। সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ব্যাংকের কর্মকর্তারাও এই দায়িত্ব পেয়ে থাকেন।
২. নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ
জেলা নির্বাচন অফিস বা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার এই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে যোগ্য ব্যক্তিদের নামের তালিকা সংগ্রহ করে তাদের নিয়োগপত্র পাঠানো হয়।
৩. বিশেষ প্রশিক্ষণ
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে পোলিং অফিসারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। সেখানে ইভিএম ব্যবহার, ব্যালট পেপার ব্যবস্থাপনা এবং নির্বাচনী আইন সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা প্রতিটি পোলিং অফিসারের জন্য বাধ্যতামূলক।
নির্বাচন চলাকালীন পোলিং অফিসারের আচরণবিধি
একজন পোলিং অফিসারকে নির্বাচনের দিন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশিকা অনুযায়ী তাদের নিচের বিষয়গুলো মেনে চলতে হয়:
- নিরপেক্ষতা: কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা যাবে না।
- গোপনীয়তা রক্ষা: ভোটার কাকে ভোট দিচ্ছেন বা দিতে চান, তা জানার চেষ্টা করা যাবে না এবং গোপন কক্ষের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
- শৃঙ্খলারক্ষা: বুথের ভেতর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রিসাইডিং অফিসারকে জানাতে হবে।
- সহযোগিতা: বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে চলাচলে (আইন মেনে) প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।
পোলিং অফিসার ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের মধ্যে সম্পর্ক
অনেকেই পোলিং অফিসার এবং সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের কাজ গুলিয়ে ফেলেন। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মূলত একটি নির্দিষ্ট বুথ বা কক্ষের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। পোলিং অফিসাররা তার নির্দেশনায় ভোটারদের তথ্য যাচাই ও কালি লাগানোর কাজ করেন। কোনো জটিলতা দেখা দিলে পোলিং অফিসার সরাসরি সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের পরামর্শ নেন।
পোলিং অফিসারের সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য পোলিং অফিসারদের নির্দিষ্ট হারে সম্মানী বা ভাতা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
১. প্রশিক্ষণ ভাতা।
২. নির্বাচনের দিনের সম্মানী।
৩. যাতায়াত ও আপ্যায়ন ভাতা।
ভোট শেষ হওয়ার পর বা পরদিন রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে এই অর্থ প্রদান করা হয়।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)
পোলিং অফিসার কি প্রিসাইডিং অফিসারের অধীনে কাজ করেন?
হ্যাঁ, ভোটকেন্দ্রের সামগ্রিক প্রধান হলেন প্রিসাইডিং অফিসার। পোলিং অফিসার এবং সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা তার প্রশাসনিক ও আইনি নির্দেশনা মেনেই কাজ করেন।
পোলিং অফিসার কি ভোট বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন?
সরাসরি ভোট বাতিল করার ক্ষমতা পোলিং অফিসারের নেই। তবে কোনো ভোটারের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে বা জাল ভোটের চেষ্টা দেখলে তিনি সেটি প্রিসাইডিং অফিসারকে জানাতে পারেন। প্রিসাইডিং অফিসার সিদ্ধান্ত নিলে সেই ভোট চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
নির্বাচনের দিন পোলিং অফিসারকে কখন কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়?
সাধারণত ভোট শুরু হওয়ার অন্তত ২ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হয়। ভোর থেকেই ব্যালট বক্স সিল করা, ভোটার তালিকা গুছিয়ে রাখা এবং ইভিএম প্রস্তুত করার কাজ শুরু করতে হয়।
একজন পোলিং অফিসার কি নিজের ভোট দিতে পারেন?
হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে তিনি যদি নিজের নির্বাচনী এলাকার বাইরে দায়িত্ব পান, তবে তাকে ‘পোস্টাল ব্যালটের’ মাধ্যমে আগেই ভোট দেওয়ার আবেদন করতে হয়।
পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে কি শাস্তি হয়?
নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, পোলিং অফিসারের কাজ কি তা কেবল নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য নয় বরং সাধারণ ভোটারদের জন্যও জানা প্রয়োজন। পোলিং অফিসাররা হলেন নির্বাচনের ফ্রন্টলাইন কর্মী যারা একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কঠোর পরিশ্রম করেন। ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে ভোট প্রদানের চূড়ান্ত ধাপ পর্যন্ত তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আপনি যদি এবার পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে থাকেন, তবে মনে রাখবেন আপনার সততা ও নিরপেক্ষতাই একটি সুন্দর গণতন্ত্রের ভিত্তি।