বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রিজাইডিং অফিসার। একটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হলেন তিনি। অনেকে মনে করেন প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ শুধু ভোট নেওয়া, কিন্তু বাস্তবে তার দায়িত্ব অনেক গভীর এবং চ্যালেঞ্জিং। আজকের এই নিবন্ধে আমরা প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি এবং তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
প্রিজাইডিং অফিসার কে?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, প্রিজাইডিং অফিসার (Presiding Officer) হলেন একটি ভোটকেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী বা ‘ইন-চার্জ’। নির্বাচন কমিশন যখন কোনো এলাকায় ভোটগ্রহণের আয়োজন করে, তখন প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য একজন করে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি সরাসরি রিটার্নিং অফিসারের অধীনে কাজ করেন এবং তার কেন্দ্রের প্রতিটি ব্যালট পেপার ও ভোটারের নিরাপত্তার জন্য দায়ী থাকেন।
আরও জেনে নিনঃ পোলিং অফিসারের কাজ কি ও দায়িত্ব?
প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি: বিস্তারিত গাইডলাইন
নির্বাচন কমিশনের (EC) নীতিমালা অনুযায়ী একজন প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্বকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে ছকের মাধ্যমে সংক্ষেপে কাজের ধরণ দেখানো হলো:
নির্বাচনী কাজের পর্যায়ক্রমিক তালিকা
| পর্যায় | প্রধান দায়িত্বসমূহ |
| ভোটের আগের দিন | সরঞ্জাম সংগ্রহ, কেন্দ্র পরিদর্শন, বুথ তৈরি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। |
| ভোটগ্রহণের দিন | এজেন্ট নিয়োগ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স প্রদর্শন, ভোট তদারকি ও শৃঙ্খলা রক্ষা। |
| ভোট পরবর্তী সময় | ব্যালট গণনা, ফলাফল বিবরণী তৈরি (ফরম-১১ ও ১২) এবং মালামাল জমা দেওয়া। |
১. নির্বাচনের আগের প্রস্তুতি ও দায়িত্ব
ভোটের অন্তত দুই দিন আগে থেকেই একজন প্রিজাইডিং অফিসারের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। এই সময়ে তার প্রধান কাজগুলো হলো:
নির্বাচনী সরঞ্জাম সংগ্রহ
তিনি রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, অমোচনীয় কালি (Indelible Ink), স্ট্যাম্প প্যাড, বিভিন্ন ধরণের সিল এবং ফরম বুঝে নেন। প্রতিটি সরঞ্জাম সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা যাচাই করা তার আবশ্যিক কর্তব্য।
কেন্দ্র ও বুথ ব্যবস্থাপনা
ভোটের আগের দিন প্রিজাইডিং অফিসারকে সশরীরে নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হয়। সেখানে ভোটারদের চলাচলের পথ এবং ভোটকক্ষ বা বুথগুলো সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করেন। নারী ও পুরুষ ভোটারদের জন্য আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করাও তার দায়িত্বের অংশ।
২. ভোটগ্রহণের দিনের প্রধান কার্যাবলি
ভোটের দিন সকাল থেকেই প্রিজাইডিং অফিসারের আসল পরীক্ষা শুরু হয়। তার অধীনে কয়েকজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার কাজ করেন।
আরও জেনে নিনঃ পোলিং এজেন্ট এর কাজ কি ও দায়িত্ব?
পোলিং এজেন্টদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া
ভোট শুরুর আগে প্রার্থীদের নিযুক্ত পোলিং এজেন্টদের নিয়োগপত্র যাচাই করেন তিনি। এজেন্টদের সামনেই খালি ব্যালট বাক্স প্রদর্শন করে তা প্লাস্টিক সিল দিয়ে লক করা হয়। এটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রমাণের প্রথম ধাপ।
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া তদারকি
সকাল ৮টা (বা নির্ধারিত সময়) থেকে ভোট শুরু হলে তিনি পুরো কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসাররা ভোটারদের আঙুলে কালি দিচ্ছেন কি না এবং ভোটাররা গোপন কক্ষে গিয়ে ভোট দিচ্ছেন কি না তা তিনি নিশ্চিত করেন।
শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা
কেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রিজাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেন। তিনি কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বা আনসার বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তিনি সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিত করার ক্ষমতা রাখেন।
৩. ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা
বিকাল ৪টায় (বা নির্ধারিত সময়) ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজটি শুরু হয়। এই পর্যায়ে প্রিজাইডিং অফিসারের কাজগুলো নিম্নরূপ:
- ব্যালট বাক্স খোলা: পোলিং এজেন্ট এবং প্রার্থীর প্রতিনিধিদের সামনেই ব্যালট বাক্সের সিল খোলা হয়।
- ভোট গণনা: প্রতিটি ব্যালট পেপার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গণনা করা হয়। বৈধ ও বাতিলকৃত ভোট আলাদা করে তালিকা করা হয়।
- ফলাফল বিবরণী প্রস্তুত: নির্ধারিত ফরমে (সাধারণত ফরম-১১ ও ১২) প্রতিটি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা লিখে ফলাফল বিবরণী তৈরি করেন। সেখানে উপস্থিত এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
- ফলাফল প্রচার: কেন্দ্রের বাইরে একটি কপি টাঙিয়ে দেওয়া হয় এবং মূল কপিটি সিলগালা করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
প্রিজাইডিং অফিসারের বিশেষ আইনি ক্ষমতা
নির্বাচন চলাকালীন একজন প্রিজাইডিং অফিসার কেবল একজন সরকারি কর্মচারী নন, বরং তিনি বিশেষ বিচারিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা ভোগ করেন:
১. গ্রেপ্তারের আদেশ: যদি কোনো ব্যক্তি ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করে, ব্যালট পেপার ছিনতাই করে বা কোনো ভোটারকে ভয় দেখায়, তবে প্রিজাইডিং অফিসার পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে তাকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করাতে পারেন।
২. কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার: নিয়ম ভঙ্গকারী যেকোনো ব্যক্তিকে তিনি ভোটকেন্দ্রের সীমানা থেকে বের করে দিতে পারেন।
৩. ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা: নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন।
সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারের সাথে পার্থক্য
অনেকেই প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ গুলিয়ে ফেলেন। নিচের তালিকায় তাদের পার্থক্য পরিষ্কার করা হলো:
- প্রিজাইডিং অফিসার (Presiding Officer): পুরো ভোটকেন্দ্রের প্রধান। তিনি সব বুথ এবং সামগ্রিক ফলাফল তদারকি করেন।
- সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার (Assistant Presiding Officer): তিনি একটি নির্দিষ্ট ভোটকক্ষ বা বুথের দায়িত্ব পালন করেন। ভোটারদের ব্যালট পেপার প্রদান এবং ব্যালটের মুড়িপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া তার কাজ।
- পোলিং অফিসার (Polling Officer): তিনি ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং তালিকায় নাম কাটেন ও অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেন।
সফলভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য কিছু জরুরি টিপস
নির্বাচন পরিচালনা করা একটি মানসিক চাপের কাজ। একজন দক্ষ প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে সফল হতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত:
- নিরপেক্ষতা বজায় রাখা: আপনার কথা বা আচরণে যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ না পায়। আপনি রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করছেন, কোনো দলের জন্য নয়।
- যোগাযোগ রক্ষা করা: সর্বদা রিটার্নিং অফিসার এবং স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানের মোবাইল নম্বর সক্রিয় রাখুন।
- কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা: প্রতিটি ফরম এবং ডায়েরি নির্ভুলভাবে পূরণ করুন। ছোট একটি ভুল বড় ধরণের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
- ধৈর্যশীল হওয়া: ভোটার বা এজেন্টদের সাথে উগ্র ব্যবহার না করে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি সামলানোই একজন লিডারের পরিচয়।
প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)
প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে কারা নিয়োগ পেতে পারেন?
সাধারণত বিসিএস ক্যাডার ভুক্ত কর্মকর্তা, সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকরা এই পদে নিয়োগ পান।
পোলিং এজেন্টদের সাথে প্রিজাইডিং অফিসারের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
পোলিং এজেন্টরা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করেন। তাদের সাথে পেশাদার সম্পর্ক রাখা জরুরি। তাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা ধৈর্য ধরে শুনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রিজাইডিং অফিসার কি ভোট বাতিল করতে পারেন?
যদি কোনো ব্যালটে সিল অস্পষ্ট হয় বা একাধিক প্রার্থীর প্রতীকে সিল থাকে, তবে নিয়ম অনুযায়ী সেই ব্যালটটিকে প্রিজাইডিং অফিসার বাতিল ঘোষণা করেন।
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার করা যাবে কি?
নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, প্রিজাইডিং অফিসার ছাড়া ভোটকেন্দ্রের ভেতরে সাধারণত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে জরুরি প্রয়োজনে তিনি তার অফিশিয়াল ফোন ব্যবহার করতে পারেন।
শেষ কথা
একটি গণতান্ত্রিক দেশের ভিত্তি হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে বিতর্কহীন রাখার সবচেয়ে বড় কারিগর হলেন প্রিজাইডিং অফিসার। ‘প্রিজাইডিং অফিসারের কাজ কি’ এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা দেখতে পাই যে, এটি কেবল একটি পদ নয়ত বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি একটি বিশাল আমানত। সঠিক পরিকল্পনা, নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করলে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব। আশা করি, এই আর্টিকেলটি আপনাকে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে।