স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির সমস্যা বর্তমানে একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ধুলোবালি এবং দূষণের এই সময়ে হাঁপানি বা অ্যাজমার প্রকোপ অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই ধরণের সমস্যার সমাধানে চিকিৎসকরা প্রায়ই মন্টিলুকাস্ট গ্রুপের ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে মন্টিলুকাস্ট গ্রুপের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের মোনাস ১০ (Monas 10)। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব মোনাস ১০ দাম কত এবং এর সঠিক ব্যবহারবিধি নিয়ে। যারা নিয়মিত এই ওষুধটি সেবন করেন বা নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য এই তথ্যগুলো অত্যন্ত জরুরি।
মোনাস ১০ ট্যাবলেটটি আসলে কী?
মোনাস ১০ হলো একটি ‘লিউকোট্রিন রিসেপ্টর এন্টাজনিস্ট’ (Leukotriene receptor antagonist) জাতীয় ওষুধ। আমাদের শরীরে লিউকোট্রিন নামক এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ থাকে যা শ্বাসনালীর প্রদাহ এবং অ্যালার্জি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। মোনাস ১০ মূলত এই রাসায়নিকের কার্যকারিতা ব্লক করে দেয়। এর ফলে ফুসফুসের শ্বাসনালীগুলো শিথিল থাকে এবং শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। এটি মূলত দীর্ঘস্থায়ী হাঁপানি বা অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
২০২৬ সালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ওষুধের দাম কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কেনার আগে বর্তমান মূল্য সম্পর্কে ধারণা রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। নিচে আমরা মোনাস ১০ এর দাম এবং এর বিস্তারিত কার্যক্রম সম্পর্কে আলোকপাত করব।
মোনাস ১০ এর ব্যবহার ও উপকারিতা
মোনাস ১০ কেবল একটি সাধারণ ট্যাবলেট নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য একটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ হতে পারে। এর প্রধান কাজগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. হাঁপানি বা অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ: হাঁপানি রোগীদের শ্বাসনালী সরু হয়ে যায় এবং মিউকাস তৈরি হওয়ার ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মোনাস ১০ নিয়মিত সেবনের ফলে শ্বাসনালীর এই ফোলাভাব কমে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২. অ্যালার্জিক রাইনাইটিস: অনেকেরই ঋতু পরিবর্তনের সময় বা ধুলোবালির সংস্পর্শে আসলে হাঁচি হয়, নাক দিয়ে পানি পড়ে বা নাক চুলকায়। এই অবস্থাকে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বলা হয়। এই ধরণের অ্যালার্জির লক্ষণ দূর করতে মোনাস ১০ অত্যন্ত কার্যকর।
৩. ব্যায়ামজনিত শ্বাসকষ্ট প্রতিরোধ: অনেক সময় শারীরিক ব্যায়াম বা পরিশ্রম করার সময় অনেকের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। একে ‘Exercise-induced bronchoconstriction’ বলা হয়। ব্যায়াম করার অন্তত ২ ঘণ্টা আগে এই ওষুধ সেবন করলে এই ধরণের সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
৪. সিজনাল অ্যালার্জি: বসন্তকালে বা শীতের শুরুতে বাতাসে থাকা ধূলিকণা বা ফুলের পরাগরেণু থেকে অনেকের অ্যালার্জি হয়। মোনাস ১০ এই ধরণের সিজনাল অ্যালার্জির চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি ওষুধ।
আরও জানতে পারেনঃ ভিগোজেল ক্রিম এর দাম কত
মোনাস ১০ দাম কত ২০২৬ (মূল্য তালিকা)
বাংলাদেশের বাজারে ওষুধের দাম নিয়মিত হালনাগাদ হয়। একমি ল্যাবরেটরিজের মোনাস ১০ সাধারণত ১০ মিলিগ্রামের ফিল্ম কোটেড ট্যাবলেটে পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী এর দাম নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে দেওয়া হলো:
| প্যাকের ধরন | পরিমাণ | বর্তমান বাজারমূল্য (MRP) |
| প্রতি পিস ট্যাবলেট | ১টি | ১৭.৫০ টাকা |
| প্রতি স্ট্রিপ | ১৫টি ট্যাবলেট | ২৬২.৫০ টাকা |
| প্রতি বক্স (২ স্ট্রিপ) | ৩০টি ট্যাবলেট | ৫২৫.০০ টাকা |
দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন ফার্মেসিতে ১০% পর্যন্ত ডিসকাউন্ট পাওয়া যেতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রতি স্ট্রিপের দাম ২৩৬ টাকা থেকে ২৪০ টাকার মধ্যে হতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কাঁচামালের দাম বাড়লে কোম্পানি যেকোনো সময় মূল্য পরিবর্তন করার অধিকার রাখে।
মোনাস ১০ খাওয়ার নিয়ম ও সঠিক সময়
ওষুধের কার্যকারিতা নির্ভর করে আপনি সেটি সঠিকভাবে সেবন করছেন কিনা তার ওপর। মোনাস ১০ দাম কত জানার পাশাপাশি এর সেবনবিধি জানাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য (১৫ বছর বা তার বেশি): প্রতিদিন রাতে একটি করে ১০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট সেবন করতে হয়। হাঁপানি বা অ্যালার্জি—উভয় ক্ষেত্রেই রাতের বেলা সেবন করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়।
- সেবনের নিয়ম: ট্যাবলেটটি পর্যাপ্ত পানির সাহায্যে গিলে খেতে হবে। এটি খাবার আগে বা পরে যেকোনো সময় খাওয়া যায়, তবে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেবন করা উত্তম।
- ব্যায়ামজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে: ব্যায়াম করার অন্তত ২ ঘণ্টা আগে একটি ট্যাবলেট সেবন করতে হবে। তবে মনে রাখবেন, দিনে একটির বেশি ট্যাবলেট কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না।
মোনাস ১০ হঠাৎ হওয়া শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা অ্যাটাকের দ্রুত উপশমকারী নয়। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আপনাকে ইনহেলার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। এটি কেবল দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মোনাস ১০ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
সব ওষুধেরই কিছু না কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। মোনাস ১০ সাধারণত রোগীরা ভালোভাবে সহ্য করতে পারেন, তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে:
- সাধারণ সমস্যা: মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা, পেটের অস্বস্তি, ডায়রিয়া বা জ্বর।
- স্নায়বিক সমস্যা: ঘুমে সমস্যা, দুঃস্বপ্ন দেখা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পাওয়া।
- বিরল সমস্যা: ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা অত্যন্ত দুর্বল অনুভব করা।
সতর্কবাণী: মন্টিলুকাস্ট বা মোনাস ১০ সেবনের ফলে কিছু মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যেমন—অত্যধিক রাগ, বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার চিন্তা। যদি ওষুধ সেবনের পর আপনার মেজাজের অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
গর্ভাবস্থায় এবং স্তন্যদানকালে ব্যবহার
গর্ভাবস্থায় মোনাস ১০ সেবনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যদিও এটি প্রেগন্যান্সি ক্যাটাগরি ‘B’ এর অন্তর্ভুক্ত, তবুও চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ ছাড়া এটি সেবন করা উচিত নয়। যদি মা এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্য এর প্রয়োজনীয়তা ঝুঁকির চেয়ে বেশি হয়, কেবল তখনই চিকিৎসক এটি প্রেসক্রাইব করে থাকেন। আবার, এই ওষুধ মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে কিনা তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, তাই স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
সাবধানতা ও ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন
যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং অন্য কোনো ওষুধ সেবন করছেন কিনা তা চিকিৎসককে জানানো জরুরি।
- অ্যালার্জি: যদি আপনার মন্টিলুকাস্ট বা এই ওষুধের অন্য কোনো উপাদানের প্রতি অ্যালার্জি থাকে, তবে এটি সেবন করবেন না।
- অন্যান্য ওষুধ: আপনি যদি লিভারের সমস্যার জন্য কোনো ওষুধ খেয়ে থাকেন বা বিশেষ কিছু অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন, তবে মোনাস ১০ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন। সাধারণত থিওফাইলিন বা প্রেডনিসোলোন জাতীয় ওষুধের সাথে এর বিশেষ কোনো মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
- লিভার ও কিডনি সমস্যা: যাদের লিভার বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মোনাস ১০ এর ডোজ সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
মোনাস ১০ এর বিকল্প কিছু ওষুধ (Alternative Brands)
যদি কোনো কারণে আপনার নিকটস্থ ফার্মেসিতে একমির মোনাস ১০ না পান, তবে আপনি একই জেনেরিক বা উপাদানের অন্য ব্র্যান্ডের ওষুধ বেছে নিতে পারেন। বাংলাদেশে আরও কিছু নামকরা কোম্পানির মন্টিলুকাস্ট ১০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট হলো:
- Montair 10 (ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস)
- Montene 10 (স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস)
- Trilock 10 (অপসোনিন ফার্মা)
- Lumona 10 (এসকায়েফ ফার্মাসিউটিক্যালস)
- Monocast 10 (বেক্সিমকো ফার্মা)
এই বিকল্প ওষুধগুলোর দামও প্রায় একই রকম (প্রতি পিস ১৫ থেকে ১৮ টাকার মধ্যে)। তবে ব্র্যান্ড পরিবর্তনের আগে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
মোনাস ১০ কি প্রতিদিন খেতে হবে?
হ্যাঁ, হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসক সাধারণত এটি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত রাতে) সেবন করার পরামর্শ দেন।
মোনাস ১০ খাওয়ার পর কি ঘুম আসে?
কিছু ক্ষেত্রে সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা মাথা ঘোরার সমস্যা হতে পারে। তবে এটি সরাসরি কোনো ঘুমের ওষুধ নয়।
হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কি মোনাস ১০ কাজ করবে?
না। হঠাৎ হওয়া অ্যাজমা অ্যাটাক বা তীব্র শ্বাসকষ্টের জন্য মোনাস ১০ দ্রুত কাজ করে না। এই ক্ষেত্রে আপনাকে সালবুটামল ইনহেলার বা জরুরি ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।
মোনাস ১০ দাম কত?
২০২৬ সালের আপডেট অনুযায়ী প্রতিটি মোনাস ১০ ট্যাবলেটের খুচরা মূল্য ১৭.৫০ টাকা। পুরো ১৫ পিসের স্ট্রিপের দাম ২৬২.৫০ টাকা।
শিশুরা কি মোনাস ১০ খেতে পারবে?
১০ মিলিগ্রামের মোনাস ১০ সাধারণত ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য। শিশুদের জন্য মোনাস ৪ মিলিগ্রাম বা ৫ মিলিগ্রামের আলাদা ডোজ পাওয়া যায়।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, মোনাস ১০ দাম কত তা জানার পাশাপাশি এর সঠিক প্রয়োগ পদ্ধতি জানা আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একমি ল্যাবরেটরিজের এই ওষুধটি হাঁপানি এবং অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং কার্যকর। তবে মনে রাখবেন, এটি একটি প্রেসক্রিপশন ড্রাগ। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে এই ওষুধ সেবন শুরু করা বা বন্ধ করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় ওষুধ সেবন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা আপনাকে একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন দিতে পারে। আপনার শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির লক্ষণগুলো যদি তীব্র হয়, তবে ঘরে বসে চিকিৎসা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।