নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পোলিং এজেন্ট বা ভোটের এজেন্টের ভূমিকা অপরিসীম। আপনি যদি এই দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা বিষয়টি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন, তবে এই নিবন্ধটি আপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড। একজন দক্ষ পোলিং এজেন্ট না থাকলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কল্পনা করা কঠিন। তাই প্রতিটি প্রার্থীর জন্য যোগ্য এবং সচেতন প্রতিনিধি নিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি।
পোলিং এজেন্ট বা ভোটের এজেন্ট আসলে কে?
বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের (EC) নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রতিটি ভোটকক্ষে (Polling Booth) একজন করে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন, যাকে পোলিং এজেন্ট বলা হয়। তারা মূলত প্রার্থীর চোখ ও কান হিসেবে ভোটকেন্দ্রে কাজ করেন। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ভোটকেন্দ্রে যাতে কোনো ধরনের কারচুপি না হয় এবং প্রার্থীর প্রতিটি ভোট যেন সঠিকভাবে গণনায় আসে। অনেক সময় অনেকে পোলিং এজেন্ট এবং নির্বাচনী এজেন্টের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। নির্বাচনী এজেন্ট পুরো নির্বাচনী এলাকার দায়িত্ব পালন করেন, আর পোলিং এজেন্ট নির্দিষ্ট একটি ভোটকক্ষের দায়িত্বে থাকেন।
আরও জানুনঃ জাপানি ভাষায় মাস, দিন, সংখ্যা বাংলা উচ্চারণসহ শিখুন
একনজরে পোলিং এজেন্ট এর কাজ কি?
সহজ কথায়, একজন পোলিং এজেন্ট হলেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রে নিযুক্ত প্রতিনিধি। তার মূল কাজ হলো ভোটগ্রহণের সময় নিজের প্রার্থীর স্বার্থ রক্ষা করা এবং নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা। ব্যালট বাক্স বা ইভিএম (EVM) যাচাই থেকে শুরু করে ভোট গণনা শেষে ফলাফল বুঝে নেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। যদি কোনো কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট না থাকে, তবে সেই কেন্দ্রে অনিয়মের সুযোগ বেড়ে যায়। তাই পোলিং এজেন্ট এর কাজ কি তা জানা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
পোলিং এজেন্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নির্বাচনী ব্যবস্থায় পোলিং এজেন্টের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নিচের তালিকাটি দেখলে আপনি এর গুরুত্ব বুঝতে পারবেন:
- ভোট জালিয়াতি বা অনিয়ম রোধ করা।
- ভোটারের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা।
- ভোট গণনার স্বচ্ছতা রক্ষা করা।
- নির্বাচনী ফলাফল বা ‘Form-45’ সংগ্রহ করা।
- প্রার্থীর আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা।
পোলিং এজেন্টের বিস্তারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য
একজন দক্ষ পোলিং এজেন্টের কাজকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: ভোট শুরুর আগে, ভোট চলাকালীন এবং ভোট গণনা শেষে। নিচে প্রতিটি ধাপ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ভোট শুরুর আগে করণীয়
ভোট শুরুর অন্তত ৩০-৬০ মিনিট আগে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া জরুরি। এই সময়ে পোলিং এজেন্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল কাজ থাকে।
| কাজের বিষয় | করণীয় কাজ |
| ব্যালট বাক্স যাচাই | ব্যালট বাক্স খালি আছে কি না তা নিশ্চিত হয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের উপস্থিতিতে তাতে সিল লাগানো পর্যবেক্ষণ করা। |
| ইভিএম পরীক্ষা | যদি ইভিএমে ভোট হয়, তবে ‘Mock Voting’-এর মাধ্যমে মেশিনটি সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা দেখে নেওয়া। |
| গোপন কক্ষ | ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষটি যাতে নিরাপদ এবং বাইরে থেকে দেখা না যায় এমন অবস্থানে থাকে, তা নিশ্চিত করা। |
| ভোটার তালিকা | প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে সরবরাহকৃত ভোটার তালিকার সাথে নিজের কাছে থাকা তালিকা মিলিয়ে নেওয়া। |
২. ভোট চলাকালীন দায়িত্ব
ভোট চলাকালীন এজেন্টকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। এই সময়টুকুতে সামান্য অসতর্কতা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- ভোটার শনাক্তকরণ: প্রিসাইডিং অফিসারের সাথে ভোটারের তালিকা মিলিয়ে দেখা। কোনো ভুয়া ভোটার মনে হলে বা অন্য কারো হয়ে ভোট দিতে আসলে চ্যালেঞ্জ (Challenge Vote) করা।
- অমোচনীয় কালি: ভোটারের আঙুলে অমোচনীয় কালি সঠিকভাবে লাগানো হচ্ছে কি না তা খেয়াল রাখা যাতে কেউ দ্বিতীয়বার ভোট দিতে না পারে।
- শৃঙ্খলারক্ষা: ভোটকেন্দ্রের ভেতর কোনো বহিরাগত বা অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ বাধা দেওয়া।
- ভোট কাস্টিং পর্যবেক্ষণ: কোনো ভোটারকে কেউ প্রভাবিত করছে কি না বা গোপন কক্ষের ভেতর কেউ উঁকি দিচ্ছে কি না তা নজরে রাখা।
৩. ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশের সময়
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। অনেক সময় দেখা যায় সারাদিন ভোট ভালো হলেও গণনার সময় কারচুপি হয়। তাই পোলিং এজেন্টকে এই সময় আপসহীন থাকতে হবে।
- সিল যাচাই: ভোট শেষ হওয়ার পর ব্যালট বাক্সের সিল অক্ষত আছে কি না দেখে নেওয়া।
- গণনায় উপস্থিতি: সরাসরি ভোট গণনার সময় উপস্থিত থেকে প্রতিটি বৈধ ও বাতিল ভোট পর্যবেক্ষণ করা। বিশেষ করে কোনো ভোট কেন বাতিল করা হচ্ছে তার কারণ জেনে নেওয়া।
- ফলাফল সংগ্রহ: ভোট গণনা শেষে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে ফলাফলের সত্যায়িত কপি বা ‘ফলাফল বিবরণী’ (Form-45) বুঝে নেওয়া এবং তাতে স্বাক্ষর করা। মনে রাখবেন, Form-45 হলো আপনার প্রার্থীর বিজয়ের আইনি দলিল।
কিভাবে একজন পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করা হয়?
বাংলাদেশের নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো মেনে সম্পন্ন হয়। পোলিং এজেন্ট নিয়োগের ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
প্রয়োজনীয় যোগ্যতা
একজন পোলিং এজেন্ট হতে হলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার হতে হয়। এছাড়া তাকে প্রার্থীর বিশ্বস্ত এবং মানসিকভাবে দৃঢ় হতে হয় যাতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রের দায়িত্ব ছেড়ে না যান।
নিয়োগপত্র সংগ্রহ ও জমাদান
প্রার্থী বা প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি নির্দিষ্ট ফরমে (সাধারণত ফরম-১০) নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। এই নিয়োগপত্রটি ভোট শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হয়। এরপর প্রিসাইডিং অফিসার পোলিং এজেন্টকে একটি পরিচয়পত্র (ID Card) প্রদান করেন যা গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হয়।
পোলিং এজেন্টের জন্য বিশেষ টিপস
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু পরামর্শ একজন পোলিং এজেন্টকে অনেক বেশি দক্ষ করে তুলতে পারে:
- নিয়মকানুন জানা: নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি ও গাইডলাইন সর্বদা সাথে রাখুন। কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হলে আইনের রেফারেন্স দিয়ে কথা বলুন।
- খাবার ও পানি: কেন্দ্রের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়, তাই নিজের খাবার ও পানির ব্যবস্থা রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ অনেক সময় বিরোধী পক্ষ খাবার বা পানির অজুহাতে আপনাকে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
- সহনশীলতা: ভোটকেন্দ্রে পরিস্থিতি অনেক সময় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় উত্তেজিত না হয়ে শান্ত থেকে প্রিসাইডিং অফিসার বা দায়িত্বরত পুলিশকে আইনানুগভাবে বিষয়টি জানান।
- সতর্ক নজরদারি: ভোট কক্ষের কোনো কোণায় বা ব্যালট পেপারে কোনো বিশেষ চিহ্ন দেওয়া হচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
একজন প্রার্থী কি একাধিক এজেন্ট রাখতে পারেন?
প্রতিটি ভোটকক্ষের (Booth) জন্য একজন এজেন্ট এবং তার বিকল্প হিসেবে আরও একজনের নাম দেওয়া যায়। তবে নির্দিষ্ট সময়ে কক্ষের ভেতর কেবল একজনই অবস্থান করতে পারবেন।
এজেন্ট কি ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার করতে পারেন?
সাধারণত নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটকক্ষের ভেতরে এজেন্টদের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকে। তবে এটি নির্দিষ্ট নির্বাচনের সময়ের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় প্রিসাইডিং অফিসারের অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ থাকে।
পোলিং এজেন্ট কি ভোট দিতে পারেন?
হ্যাঁ, যদি তিনি সেই এলাকার ভোটার হন তবে তিনি অবশ্যই নিজের ভোট দিতে পারবেন। তবে দায়িত্ব পালনের স্বার্থে তিনি ব্যালট পেপারের মাধ্যমে বা নির্দিষ্ট বিরতিতে ভোট দিয়ে আবার নিজ স্থানে ফিরে আসতে পারেন।
প্রিসাইডিং অফিসার কি এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দিতে পারেন?
যদি কোনো এজেন্ট নির্বাচনী আইন ভঙ্গ করেন বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, তবে প্রিসাইডিং অফিসার তাকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তবে কারণ ছাড়া কোনো বৈধ এজেন্টকে বের করা আইনত দণ্ডনীয়।
শেষ কথা
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে পোলিং এজেন্টের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন সচেতন ও দক্ষ এজেন্ট যেমন অনিয়ম রুখে দিতে পারেন, তেমনি তার প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে আইনসম্মতভাবে সহায়তা করতে পারেন। পোলিং এজেন্ট এর কাজ কি তা কেবল জানলেই হবে না, বরং সাহসের সাথে তা পালন করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিটি ভোট যেন সঠিক বাক্সে পড়ে এবং প্রতিটি কণ্ঠস্বর যেন মূল্যায়িত হয়, তা নিশ্চিত করাই একজন আদর্শ এজেন্টের কাজ। দায়িত্ব পালনের আগে স্থানীয় নির্বাচনী অফিস বা প্রার্থীর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা সবসময়ই লাভজনক।